বিশেষ প্রতিবেদন

করোনার ৩ মাস: কোন অবস্থায় বাংলাদেশ, ভবিষ্যত কী?


বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্তের তিন মাস পূর্ণ হলো আজ। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো একদিনেই তিনজনের শরীরে করোনা পজেটিভ পাওয়া গিয়েছিল বলে জানিয়েছিল সরকারের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর)। ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর দুঃসংবাদ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এরপর প্রায় প্রতিদিনই বাড়তে থাকে আক্রান্ত। বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষত এপ্রিলের মাঝামাঝির পর থেকে দেশে নভেল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু ব্যাপক আকার ধারণ করেন। এরপর মাঝে কিছুটা স্তিমিত হলেও ঈদ কেন্দ্রিক দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের অবাধ গমনাগমনে গত ২ সপ্তাহ ধরে ব্যাপক হারে দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে।

গতকাল রবিবার পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৭৬৯ জন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও নতুন করে আরও ২ হাজার ৭৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮৮ জনে।

ঊর্ধ্বমুখী এই সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার এলাকাভিত্তিক লকডাউনের উদ্যোগ নিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যার ভিত্তিতে দেশকে রেড, ইয়োলো ও গ্রিন এই তিনটি জোনে ভাগ করছে সরকার।

সর্বোপরি সরকার চাইছে, করোনা সংক্রমণ রোধের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। কোন এলাকায় কোন রঙ থাকবে সেটার জন্য বিভিন্ন নীতিমালাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইট (করোনা ইনফো) থেকে রবিবার (৭ জুন) প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইতোমধ্যে সরকার দেশের ৩টি বিভাগসহ ৫০টি জেলা ও ৪০০ উপজেলাকে রেড জোন বা শতভাগ লকডাউন ঘোষণা করেছে। ৫টি বিভাগ, ১৩টি জেলা ও ১৯টি উপজেলাকে ইয়োলো জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর গ্রিন জোন দেখানো হয়েছে ১টি জেলা ও ৭৫টি উপজেলাকে।

গেল ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশের হুবেই প্রদেশে করোনার অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। হুবেইকেই ধরা হয় করোনা ভাইরাসের উৎসস্থল। কিন্তু শনাক্তের পরবর্তী তিনমাসে চীন যেখানে তাদের দেশের করোনা পরিস্থিতি ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল, বাংলাদেশে চিত্রটা ঠিক ভিন্ন। বাংলাদেশে ৮ জুন করোনা শনাক্তের তিন মাসের মাথায় দেশের মানুষকে দেখতে হচ্ছে হতাশা ও ভীতির চিত্র। দেশের ৫০টি জেলায় নতুন করে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩টি জেলা আছে ইয়োলো জোনে।

আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনা পরিস্থিতির দিকে চোখ রাখি তাহলে দেখতে পাই, সেদেশেও করোনা হানা দেয়ার পরবর্তী তিন মাসের মাথায় পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। কমেছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি করোনা ভাইরাসের ছোবল শুরু হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ জন। ১৬ মার্চ সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬০৯ জনে। ১৫ এপ্রিল তা বেড়ে হয় ৬ লাখ ২৪ হাজার ২৩৭ জন। ১৫ মে বেড়ে হয় ১৪ লাখ ৯২ হাজার ২৯৫ জন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ৭ হাজার ৪৪৯ জন। এখন দেশটিতে আক্রান্ত ও মৃত্যু তুলনামূলকভাবে কিছুটা হলেও কমেছে।

একইভাবে যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ইরানেও গত কয়েক মাস লড়াইয়ের পর আক্রান্ত ও মৃত্যু অনেকটা কমে এসেছে।

তাহলে গত ৩ মাসে বাংলাদেশের অগ্রগতি কি? করোনাকে কতটা সামাল দিতে পেরেছি আমরা? আজ করোনা সংক্রমণের ৩ মাস পূরণের দিনে জনগণের মনে এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। আগামী তিন মাস পরই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে- সেটি নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে জনমনে।

দেশের মানুষকে করোনার সংক্রমণের ভয় প্রতিটা মুহূর্তে তাড়া করছে। তবে মানুষ এখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই গা-সওয়া ভাব নিয়েও মানুষের স্বস্তি নেই। দুঃশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা কেবলই বাড়ছে।

সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রতিনিয়ত দাবি করা হচ্ছে, করোনা চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে কিংবা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। এখনও রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে পারছে না। অনেকেই ভর্তি হতে না পেরে বাধ্য হয়েই বাড়িতে ফিরে আসছে। সঠিক পরামর্শের অভাবে অনেকেই বাড়িতে থেকেই ভুগতে ভুগতে মারা যাচ্ছে।

এছাড়া হাসপাতালে এখনও জনবলের সংকট যেমন আছে, তেমনি আছে অক্সিজেনের স্বল্পতা। খুব সামান্য সংখ্যক রোগী আইসিইউ সেবা নিতে পারছেন। অন্যদিকে ৪০ হাজারের বেশি রোগী নিজ দায়িত্বে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের অনেকেই মারাও যাচ্ছে।

দেশের স্বাস্থ্যখাতের এই অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসখ্যানের মধ্যেও সরকারের মন্ত্রীদের মুখে আত্মতুষ্টি শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সময়ে।

গত ২১ মার্চ ধানমন্ডিতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী।’ এরও আগে গত ৩ মার্চ সচিবালয়ে এক সভা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোনোভাবে করোনা ভাইরাস চলে এসে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা আগে থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে আছি।’

তবে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে শুধু মুখের কথায় নয়, জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ কোনও উদ্যোগহ না নিলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ধারা জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত তিন মাসে আমরা অনেক কিছুই করেছি। কিন্তু প্রতিটি কাজই করেছি ঢিলেঢালাভাবে। সামনে আমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময়। সবকিছু বিবেচনা করে আঁটসাঁটভাবে এখন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।