শীর্ষ সংবাদস্বাস্থ্য

অনিশ্চয়তার মাঝে ১৯১৯ চিকিৎসকের ভাগ্য


সারাদেশের হাসপাতালগুলোতেই রয়েছে চিকিৎসক সংকট। নতুন পদ সৃষ্টি হচ্ছে না, শূন্য রয়েছে অনেক পদ। করোনাকালে এই সংকট বেড়েছে কয়েকগুণ। মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্যখাতের এই দূরবস্থা। সংকট নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে হাসপাতালগুলো। তবুও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, স্বাস্থ্যখাতের এই সংকটের পরেও ৪২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রায় দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

পিএসসি বলছে, পদ স্বল্পতার কারণে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, ১১ হাজার পদ শূন্য। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, ‘তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।’

মুজিববর্ষে স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন ৩০ নভেম্বর, ২০২০ তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে দুই হাজার চিকিৎসককে ‘সহকারী সার্জন’ পদে নিয়োগের কথা বলা হয়। পরে ৩০ জুন, ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সভায় আরও চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পিএসসির মোট ছয় হাজার চিকিৎসক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত থাকলেও অদৃশ্য কারণে পরে ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নবনিয়োগ শাখার এক বিজ্ঞপ্তিতে চার হাজারের পরিবর্তে দুই হাজার অতিরিক্ত চিকিৎসক নেওয়ার কথা জানানো হয়। ৪২তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী মোট পাঁচ হাজার ৯১৯ জন উত্তীর্ণ হলেও পিএসসি পদ স্বল্পতার কারণে চার হাজার জনকে সহকারী সার্জন পদে নিয়োগের সুপারিশ করে। অবশিষ্ট ১৯শ ১৯ জনকে পদ স্বল্পতার কারণে নিয়োগে সুপারিশ করেনি।

সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা ফুটে উঠেছে। স্বাস্থ্যের তথ্য জানে না সুপিরিয়র মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন। চিকিৎসকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিএমএ-ও দেখছে না দুই মন্ত্রণালয়ের দায়। তারা দুষছে পিএসসিকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১: ১০০০ থাকতে হয়। সেখানে বাংলাদেশে আছে ১: ১৭২৪।

জান যায়, ৩৮তম বিসিএস থেকে ২৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৪২তম বিসিএস (বিশেষ) থেকে চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের অপেক্ষায় আছেন। ৪০তম বিসিএস থেকে ২৬০ জন এবং ৪১তম বিসিএস থেকে আরও ১১০ জন চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণের কার্যক্রম চলমান। এরপরও শূন্য রয়ে গেছে ৬ হাজার ৭০৪ পদ। তবে কোভিড পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন পাঁচটি বিসিএস পরীক্ষা ও সুপারিশসংক্রান্ত জটে হিমশিম খাচ্ছে বিধায় আগামী ২-৪ বছরের আগে এসব শূন্যপদ পূরণ অসম্ভব।

সব মিলিয়ে ৪২তম বিসিএস (বিশেষ) এর চার হাজার জন চিকিৎসক নিয়োগ পাওয়ার পরেও বর্তমানে দেশের সরকারি চিকিৎসা সেবাদান কেন্দ্রগুলোতে ছয় হাজার ৭০৪টি পদ শূন্য থাকবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের এইচআরআইএস রিপোর্টের (গত ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখের) তথ্যানুযায়ী, শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে পাঁচ হাজার ৮৪৮টি। এছাড়া, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, করোনায় এ পর্যন্ত ১৮৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মারা গেছেন। ফলে, কিছুটা হলেও দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সেবাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

৪২তম বিসিএস (বিশেষ) হতে উত্তীর্ণ অপেক্ষমাণ এই ১৯শ ১৯ জন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হলে এই সমস্যা ও সম্ভাব্য সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

তারা বলছেন, চিকিৎসকদের জন্য আগের প্রতিটি বিশেষ বিসিএসে ছয় হাজারের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৩৯তম বিসিএস (বিশেষ) এ সহকারী সার্জন হয়েছেন ছয় হাজার ২০৩ জন আর ৩৩তম বিসিএস এ সহকারী সার্জন হয়েছেন ছয় হাজার ৩৪২ জন। তাহলে এই মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ছয় হাজারের বেশি চিকিৎসক নিয়োগ কেন নয়?

তাদের দাবি, ২০২১ সালে এরই মধ্যেই চার হাজার জন চিকিৎসককে ‘সহকারী সার্জন’ ও ৪০৯ জন অ্যানেসথেশিওলজিস্টকে ‘জুনিয়র কনসালট্যান্ট’ পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। ৪২তম বিসিএস (বিশেষ) এর সুপারিশ বঞ্চিত ১৯শ ১৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলে ২০২১ সালে মোট চিকিৎসক নিয়োগের সংখ্যা হবে ছয় হাজার ৩২৮ জন, যা নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যখাতে সংকট ঘুঁচিয়ে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শোভা বর্ধন করবে।