জাতীয়শীর্ষ সংবাদ

দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের অপেক্ষায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আদ্যপ্রান্ত


পটুয়াখালীর পায়রা নদীর তীরে এক হাজার একর জমিতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার এ উপলক্ষে কলাপাড়ায় আসছেন তিনি।

তিন নদীর মোহনামুখে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য ছয় বছর আগে স্থানও নির্বাচন করে গিয়েছিলেন তিনি।

সোমবার সকাল ১১টার দিকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিদর্শন ও ফলক উন্মোচন করার সূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। দুপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা করার কথা রয়েছে তার।

২০১৪ সালে শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় বাংলাদেশের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) মধ্যে যৌথ উদ্যোগে এ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হয়। পরে গঠিত হয় বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।

ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় পায়রার এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে চীনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এনইপিসি ও সিইসিসি কনসোর্টিয়াম।

প্রায় আড়াইশো কোটি মার্কিন ডলার বা ১২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের এপ্রিলে; ছয় মাস পর অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল দ্বিতীয় ইউনিটের।

বড় অঙ্কের এ নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক ও চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এ কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ঠিক করা হয় ৬ টাকা ৬৫ পয়সা। তবে নানা জটিলতার কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদনে আসে দুই বছর পর।

যদিও ২০২০ সালের মে থেকেই কেন্দ্রটির ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিট পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া শুরু করে। ওই বছরের শেষ দিকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয় দ্বিতীয় ইউনিটও। ইতোমধ্যে সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা অনুযায়ী মোট ৫৫০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে।

রোববার উদ্বোধনের আগের দিন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা এ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

এসময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের জন্য। দেশে এত বৃহৎ এবং সর্বাধুনিক প্রকল্প হয়নি কখনও। এশিয়ার মধ্যে তৃতীয় এবং বিশ্বে ১১তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্লান্ট চালু করেছে।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু সম্পন্ন হওয়ার পর এই অঞ্চলে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হবে। সেই চাহিদা পূরণের কর্মযজ্ঞ চলছে। বর্তামান কয়লার মূল্য বিবেচনায় নিলেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অন্যসবগুলোর চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যের।

পায়রার তীরে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২১ মার্চ

মূল উৎপাদন কেন্দ্রের একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্টদের আবাসিক এলাকা এবং অন্যপাশে রয়েছে প্রশাসনিক ভবন।

মাঝে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা হাব, কুলিং ইউনিট, উৎপাদন ইউনিটসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিগুলো সক্রিয় রয়েছে। একটি সুউচ্চ চিমনি দিয়ে বাষ্পীয় রঙের ধোঁয়া উড়ে গিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। এর বাইরে কেন্দ্র এলাকা বেশ পরিচ্ছিন্ন ও পরিপাটি।

পরিবেশগত ঝুঁকিঃ

প্রকৌশলী এএম খোরশেদ বলেন, এ বিদ্যুৎকেন্দ্র সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে যেন পরিবেশ সুরক্ষা পায়। সালফার, নাইট্রোজেন আর কয়লাবর্জ্য দ্বারা হতে পারত দূষণ। এ ক্ষতি এড়াতে ৫ থেকে ৭ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ আমরা এখানে যুক্ত করেছি। সালফারের ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের নির্ধারিত মাত্রা হচ্ছে ২০০। আমাদের এখানে সালফার নির্গমণের মাত্রা ১০০ থেকে ১১০। নাইট্রোজেন অক্সাইডের অনুমোদিত মাত্রা ৬০০, আমাদের এখানে সাড়ে ৩০০ এর মধ্যে ধরে রাখা গেছে।

“পার্টিকুলার ম্যাটারে বিশ্ব ব্যাংকের মাত্রা হচ্ছে ৫০। আমাদের এখানে সেটাকে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখছি। আমরা যে মাত্রাগুলো বলেছি সেটা চ্যালেঞ্জ। যেকেউ পরীক্ষা করে দেখতে পারেন এখনকার দূষণের মাত্রা।“

সালফারের দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এফজিডি (ফুয়েল গ্যাস ডিসালফারাইজেশন) ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এটি কয়লা থেকে সালফার ডাই অক্সাইডকে সরিয়ে ফেলে। নাইট্রোজেন অক্সাইডকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে লো নোক্স বার্নার ব্যবহার করে। একইভাবে কঠিন বর্জ্যও নানা প্রযুক্তি প্রয়োগ করে দুষণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।”

পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনঃ
২০২০ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হলেও সঞ্চালন লাইন না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। মূলত পদ্মা নদী পারি দিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের লাইন তৈরি না হওয়ায় এ বিলম্ব হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

প্রকৌশলী খোরশেদ বলেন, সঞ্চালন লাইন কলাপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে ঢাকার আমিন বাজার পর্যন্ত যাওয়ার কথা। মাঝখানে পদ্মা নদী পার হতে গিয়ে টাওয়ার নির্মাণে বেশ কিছু জটিলতা হচ্ছে। এটা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা কাজ। আশা করছি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হয়ে যাবে।

“সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হয়ে গেলে গোপালগঞ্জে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু রেখে, বাকিটা আমিন বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই আরেকটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হলে অবশিষ্ট সাড়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খুলনা হয়ে যশোর পর্যন্ত নিয়ে নেওয়া যবে।“

তিনি বলেন, এখন গোপালগঞ্জ সাবস্টেশনে ৬০০ থেকে সাড়ে ৬০০ মেগাওয়াট যাচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে একটা সাবস্টেশন করা আছে। সেখানে ১০০ থেকে দেড়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।

ওই এলাকাতেই ১৩২০ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্পে নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেটি উৎপাদনে যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। ২২ শতাংশ কাজ এগিয়ে গেছে বলে জানান এই প্রকৌশলী।